কিছু সিরিজ শুরু হয় গল্পে, কিছু শুরু হয় চরিত্রে আর কিছু শুরু হয় মাত্র এক শব্দ থেকে, যা কানে ঢোকার পর আর বেরোতে চায় না। “এই হারামজাদী, ভাত দে” এক লাইনের মধ্যে লুকিয়ে ‘কালীপটকা’র সত্যিকারের সত্তা। শব্দটি নিছক অশ্রাব্য নয়; যার ভিতরে জমে আছে শুধু খিদে নয়, অপমান, বঞ্চনা আর পুরুষতান্ত্রিক সমাজ যখন টিপে ধরে, নিষ্ঠুরভাবে, আর তার উল্টোদিকে দমবন্ধ করা আর্তনাদও। এই শব্দ ধরেই পরিচালক অভিরূপ ঘোষ সিরিজটির ভাবনা শুরু করেছিলেন।
কিন্তু সমাজের, আরও স্পষ্ট করে বললে পুরুষদের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে সেই সত্যকে যেমনভাবে সামনে আনা দরকার ছিল, তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তাই বদলাতে হয়েছে নাম প্রাথমিক ভাবনার ‘ফাটিয়ে’ রূপান্তরিত হয়ে শেষ পর্যন্ত দাঁড়ায় ‘কালীপটকা’। আর সেই নামেই তৈরি হয়েছে এমন এক সিরিজ, যা একদিকে ‘মস্তি’ দেয়, অন্যদিকে ভেতরটা ‘হিলিয়ে’ দেয়; অস্বস্তি জাগায়, কখনও খানিক গা ঘিনঘিন করে তোলে ঠিক যেমনটা সৎ, নির্ভীক ডার্ক থ্রিলারের কাছ থেকে প্রত্যাশা করা যায়।
চারজন নারী। সমাজের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা, প্রতিদিন লড়াই করে বেঁচে থাকা চার আলাদা জীবন। বস্তির গলিতে, অন্ধকার রাতের ভেতর, ছোট ছোট স্বপ্ন আর বড় বড় অসম্মানের মাঝে অস্তিত্ব। সেই জীবনের মাঝেই হঠাৎ ঘটে যায় এক দুর্ঘটনা একটা অপরাধ, যা (মনে মনে চেয়েছিল) আবার হয়তো কেউ চায়নি, কিন্তু ঘটে গেছে। অথচ, যা বেশ হয়েছে। আর সে অপরাধ ঢাকতে গিয়েই তারা ঢুকে পড়ে আরও গভীর, আরও নোংরা অপরাধজগতে।
ফিরব বললে ফেরা যায় নাকি? এখনও অনেক পথ হাঁটা বাকি। একটার পর একটা সীমা পেরোতে থাকে, সিদ্ধান্ত ঠেলে দেয় আরও অন্ধকারের দিকে ‘কালীপটকা’র সাত এপিসোডের টানটান উত্তেজনা এতটাই থাকতে পারে।
অভিরূপ ঘোষ, পরিচালক। হাত পাকিয়েছেন ভিন্ন জঁরে। তবে এই সিরিজে ‘নারী’র টান ধরতে পেরেছেন। তাই ‘মাসুলভ’ অনুভূতি বারবার ঠাঁই পেয়েছে প্রায় প্রত্যেকটি নারী চরিত্রে। অরিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা চিত্রনাট্য শ্বাস নিতে দিচ্ছে না ঠিকই, কিন্তু প্রয়োজন ছিল, কিছু ইমোশনাল দৃশ্য, যেখানে সংলাপ থাকবে না, মুহূর্ত তৈরি হবে। সেই সংখ্যাও খানিক কম। সিরিজের দৈর্ঘ্য ছোট বলেই তা কারণ হয়ে উঠতে পারে। সম্পাদনার দায়িত্বে সুমিত সি.র প্রথম দৃশ্য থেকে শেষ ফ্রেম পর্যন্ত একটা চাপা টেনশন রয়েছে, যা জরুরি, যা বিঞ্জ ওয়াচে বাধ্য করে।
সিরিজের সবচেয়ে বড় বাজিমাত অবশ্যই সংলাপ। সৌমিত দেব এমন ভাষা লিখেছেন, যা কাগজে পড়লে অশ্রাব্য, কুৎসিত, নোংরা কিন্তু সিরিজে শুনলে অবিশ্বাস্য রকম জীবন্ত। ‘খিস্তি’ আছে, প্রচুর আছে, সস্তা তবে শক ভ্যালু নেই। চরিত্র, পরিস্থিতি আর মুহূর্তের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। যে বিরক্তির বদলে অভ্যাস হয়ে উঠছে। পাঞ্চলাইন এসে খাপ খেয়ে যায় সেই গালিগাজে। অনেকক্ষণ মাথাতেও ঘোরে। তবে এখানেও খানিক ‘কিন্তু’ কিছু চরিত্রর মুখে গালাগাল বলাটা ঠিক মানানসই হচ্ছে না, যেমন নবাগতা হিমিকা বোস (রিঙ্কু), পিছলে যাচ্ছে, বেশ কিছু সংলাপে। কারণ হতে পারে তাঁর প্রথম বাংলা ভাষায় অভিনয়। তবে তিনি ভাল। ধুরন্ধর নয়।
স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়। প্রথম থেকেই চালিয়ে খেলেছেন। জোরা ভ্রু, তাকানো, ঠোঁটের কোণ, সংলাপ বলার ভঙ্গি সব মিলিয়ে তাঁর উপস্থিতি তীব্র, বিশ্বাসযোগ্য। পরিচালক যে ব্যাটন তাঁকেই দিয়েছেন, তা বুঝতে সময় লাগবে না। তিনি ক্রিজ ছাড়েননি, তবে যা করেছেন, তা হল বাকিদের ব্যাট চালানোর তামাম জায়গা করে দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে যাঁর কথা আলাদা করে প্রশংসা দাবি করেন, শ্রুতি দাস । তাঁর চরিত্রে এমন এক সোয়্যাগ, আছে, যা সিরিজ জুড়ে ভেসে বেড়ায়। দিনে রানি রাতে কাজল! আহা! চরিত্রটি যেমন লেখা, শ্রুতি সেটাকে তেমনভাবেই দাপট নিয়ে স্ক্রিনে ছুড়ে দেন। শ্রেয়া ভট্টাচার্যের চরিত্রটি ছিঁচকাদুনে ও ভাঙা মননের হলেও, হালকা কমেডি আছে, আর এই দু’দিকেই তিনি স্বাভাবিক। বুদ্ধি আর ধূর্ততা ব্যালেন্স করেছেন দারুণ।
আর এই চার নারীর বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা অভিনেতা অনির্বাণ চক্রবর্তীকে সাধারণত কৌতুকের সঙ্গে জুড়ে দেখা যায়, ‘একেনবাবু’ কিংবা ‘জটায়ূ’ ভেবেই সামলে নিই। এখানে তিনি নিরেট অন্ধকারে। হাসি নেই ব্যাড গাই। অস্বস্তিকর। ভয় ধরায়। স্ক্রিনটাইম খানিক কম হলেও, যতটুকুতে তিনি আছেন, ছাপ রেখে গিয়েছেন। পার্শ্বচরিত্ররা মন্দ নন, কিন্তু খুব জোরালোও নন। সৌমেন বোস আর রুকমা রায় তাঁদের প্রাপ্ত জায়গাটা ঠিকঠাক সামলেছেন। শ্রুতি দাসের শাশুড়ির চরিত্রে যিনি অভিনয় করেছেন, তাঁর কাজ আলাদা করে নজর কাড়ে।
‘কালীপটকা এক সাহসী উচ্চারণ যা নারীদের মুখ থেকেই বেরিয়ে আসে। খানে নারী ক্ষমতায়ন কোনও স্লোগানের মোড়কে পরিবেশিত হয় না; তা গড়ে ওঠে সিদ্ধান্তের টানাপড়েন আর বাস্তব পরিস্থিতির চাপে। শক্ত হওয়া মানে নিখুঁত হওয়া নয় ভেঙে পড়েও আবার দাঁড়িয়ে যাওয়ার জেদ। ভায়োলেন্স প্রবল, কিছু দৃশ্য গা শিউরে ওঠার মতো দুর্বলচিত্তের দর্শকের সাবধান থাকা ভাল। ‘কালীপটকা’ ঠিক যেমন একসঙ্গে ফাটে না। একের পর এক ফাটে। এই ‘কালীপটকা’ও তাই। পার্থক্য একটাই, তবে ‘ফাটে’ না ফাটায়!
কিন্তু সমাজের, আরও স্পষ্ট করে বললে পুরুষদের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে সেই সত্যকে যেমনভাবে সামনে আনা দরকার ছিল, তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তাই বদলাতে হয়েছে নাম প্রাথমিক ভাবনার ‘ফাটিয়ে’ রূপান্তরিত হয়ে শেষ পর্যন্ত দাঁড়ায় ‘কালীপটকা’। আর সেই নামেই তৈরি হয়েছে এমন এক সিরিজ, যা একদিকে ‘মস্তি’ দেয়, অন্যদিকে ভেতরটা ‘হিলিয়ে’ দেয়; অস্বস্তি জাগায়, কখনও খানিক গা ঘিনঘিন করে তোলে ঠিক যেমনটা সৎ, নির্ভীক ডার্ক থ্রিলারের কাছ থেকে প্রত্যাশা করা যায়।
চারজন নারী। সমাজের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা, প্রতিদিন লড়াই করে বেঁচে থাকা চার আলাদা জীবন। বস্তির গলিতে, অন্ধকার রাতের ভেতর, ছোট ছোট স্বপ্ন আর বড় বড় অসম্মানের মাঝে অস্তিত্ব। সেই জীবনের মাঝেই হঠাৎ ঘটে যায় এক দুর্ঘটনা একটা অপরাধ, যা (মনে মনে চেয়েছিল) আবার হয়তো কেউ চায়নি, কিন্তু ঘটে গেছে। অথচ, যা বেশ হয়েছে। আর সে অপরাধ ঢাকতে গিয়েই তারা ঢুকে পড়ে আরও গভীর, আরও নোংরা অপরাধজগতে।
ফিরব বললে ফেরা যায় নাকি? এখনও অনেক পথ হাঁটা বাকি। একটার পর একটা সীমা পেরোতে থাকে, সিদ্ধান্ত ঠেলে দেয় আরও অন্ধকারের দিকে ‘কালীপটকা’র সাত এপিসোডের টানটান উত্তেজনা এতটাই থাকতে পারে।
অভিরূপ ঘোষ, পরিচালক। হাত পাকিয়েছেন ভিন্ন জঁরে। তবে এই সিরিজে ‘নারী’র টান ধরতে পেরেছেন। তাই ‘মাসুলভ’ অনুভূতি বারবার ঠাঁই পেয়েছে প্রায় প্রত্যেকটি নারী চরিত্রে। অরিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা চিত্রনাট্য শ্বাস নিতে দিচ্ছে না ঠিকই, কিন্তু প্রয়োজন ছিল, কিছু ইমোশনাল দৃশ্য, যেখানে সংলাপ থাকবে না, মুহূর্ত তৈরি হবে। সেই সংখ্যাও খানিক কম। সিরিজের দৈর্ঘ্য ছোট বলেই তা কারণ হয়ে উঠতে পারে। সম্পাদনার দায়িত্বে সুমিত সি.র প্রথম দৃশ্য থেকে শেষ ফ্রেম পর্যন্ত একটা চাপা টেনশন রয়েছে, যা জরুরি, যা বিঞ্জ ওয়াচে বাধ্য করে।
সিরিজের সবচেয়ে বড় বাজিমাত অবশ্যই সংলাপ। সৌমিত দেব এমন ভাষা লিখেছেন, যা কাগজে পড়লে অশ্রাব্য, কুৎসিত, নোংরা কিন্তু সিরিজে শুনলে অবিশ্বাস্য রকম জীবন্ত। ‘খিস্তি’ আছে, প্রচুর আছে, সস্তা তবে শক ভ্যালু নেই। চরিত্র, পরিস্থিতি আর মুহূর্তের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। যে বিরক্তির বদলে অভ্যাস হয়ে উঠছে। পাঞ্চলাইন এসে খাপ খেয়ে যায় সেই গালিগাজে। অনেকক্ষণ মাথাতেও ঘোরে। তবে এখানেও খানিক ‘কিন্তু’ কিছু চরিত্রর মুখে গালাগাল বলাটা ঠিক মানানসই হচ্ছে না, যেমন নবাগতা হিমিকা বোস (রিঙ্কু), পিছলে যাচ্ছে, বেশ কিছু সংলাপে। কারণ হতে পারে তাঁর প্রথম বাংলা ভাষায় অভিনয়। তবে তিনি ভাল। ধুরন্ধর নয়।
স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়। প্রথম থেকেই চালিয়ে খেলেছেন। জোরা ভ্রু, তাকানো, ঠোঁটের কোণ, সংলাপ বলার ভঙ্গি সব মিলিয়ে তাঁর উপস্থিতি তীব্র, বিশ্বাসযোগ্য। পরিচালক যে ব্যাটন তাঁকেই দিয়েছেন, তা বুঝতে সময় লাগবে না। তিনি ক্রিজ ছাড়েননি, তবে যা করেছেন, তা হল বাকিদের ব্যাট চালানোর তামাম জায়গা করে দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে যাঁর কথা আলাদা করে প্রশংসা দাবি করেন, শ্রুতি দাস । তাঁর চরিত্রে এমন এক সোয়্যাগ, আছে, যা সিরিজ জুড়ে ভেসে বেড়ায়। দিনে রানি রাতে কাজল! আহা! চরিত্রটি যেমন লেখা, শ্রুতি সেটাকে তেমনভাবেই দাপট নিয়ে স্ক্রিনে ছুড়ে দেন। শ্রেয়া ভট্টাচার্যের চরিত্রটি ছিঁচকাদুনে ও ভাঙা মননের হলেও, হালকা কমেডি আছে, আর এই দু’দিকেই তিনি স্বাভাবিক। বুদ্ধি আর ধূর্ততা ব্যালেন্স করেছেন দারুণ।
আর এই চার নারীর বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা অভিনেতা অনির্বাণ চক্রবর্তীকে সাধারণত কৌতুকের সঙ্গে জুড়ে দেখা যায়, ‘একেনবাবু’ কিংবা ‘জটায়ূ’ ভেবেই সামলে নিই। এখানে তিনি নিরেট অন্ধকারে। হাসি নেই ব্যাড গাই। অস্বস্তিকর। ভয় ধরায়। স্ক্রিনটাইম খানিক কম হলেও, যতটুকুতে তিনি আছেন, ছাপ রেখে গিয়েছেন। পার্শ্বচরিত্ররা মন্দ নন, কিন্তু খুব জোরালোও নন। সৌমেন বোস আর রুকমা রায় তাঁদের প্রাপ্ত জায়গাটা ঠিকঠাক সামলেছেন। শ্রুতি দাসের শাশুড়ির চরিত্রে যিনি অভিনয় করেছেন, তাঁর কাজ আলাদা করে নজর কাড়ে।
‘কালীপটকা এক সাহসী উচ্চারণ যা নারীদের মুখ থেকেই বেরিয়ে আসে। খানে নারী ক্ষমতায়ন কোনও স্লোগানের মোড়কে পরিবেশিত হয় না; তা গড়ে ওঠে সিদ্ধান্তের টানাপড়েন আর বাস্তব পরিস্থিতির চাপে। শক্ত হওয়া মানে নিখুঁত হওয়া নয় ভেঙে পড়েও আবার দাঁড়িয়ে যাওয়ার জেদ। ভায়োলেন্স প্রবল, কিছু দৃশ্য গা শিউরে ওঠার মতো দুর্বলচিত্তের দর্শকের সাবধান থাকা ভাল। ‘কালীপটকা’ ঠিক যেমন একসঙ্গে ফাটে না। একের পর এক ফাটে। এই ‘কালীপটকা’ও তাই। পার্থক্য একটাই, তবে ‘ফাটে’ না ফাটায়!
তামান্না হাবিব নিশু